
রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর পবা উপজেলায় পৈতৃক জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করতে গিয়ে মামলা না নিয়ে প্রতিপক্ষের কথার সুরে সুর মিলিয়ে শুধু লিখিত অভিযোগ নেওয়ার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এক ভুক্তভোগী।
এ ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে পবা উপজেলার মথুরা তালতলা মোড়ে সংবাদ সম্মেলন করেন হারুনুর রশীদ।
লিখিত বক্তব্যে হারুন বলেন, আদালতের রায়ের পর ২০১৭ সালে পুলিশ ও আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিরোধপূর্ণ জমির দখল বুঝে পেলেও প্রতিপক্ষ বারবার তাঁর বিরুদ্ধে জমি নিয়ে হীন চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
ভুক্তভোগী হারুন জানান, গত ১৫ সেপ্টেম্বর পবা উপজেলার খণ্ডক্ষেত্র গ্রামে তাঁর জমিতে মাসকলাইয়ের বীজ রোপণের সময় তাঁর সৎ ভাই ময়েন দেওয়ান, আমিনুল দেওয়ান, একরাম দেওয়ান, ইব্রাহিম দেওয়ান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্য আকলিমা, শাহানাজ, ছামেনাসহ ১০ থেকে ১৫ জন তাঁকে মারধর করেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী শ্যামলীও আহত হন।
হারুনের ভাষ্য, হামলার পর তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্ত্রীকে হাসপাতালে রেখে তিনি পবা থানায় মামলা করতে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, যাঁদের বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করতে এসেছেন, তাঁদের কয়েকজন আগে থেকেই এক এসআইসহ ওসির কক্ষে বসে কথাবার্তা বলছেন।
হারুন বলেন, থানায় কর্তব্যরত এসআই নাদিম তাঁর কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চান এবং জমির কাগজপত্র দেখতে চান। ওই পুলিশ কর্মকর্তা জমিটি সম্পর্কে অবগত আছেন বলেও জানান। তাঁর দাবি, উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই না করেই একরাম দেওয়ানদের কাগজপত্র হালনাগাদ রয়েছে বলে জানানো হয়।
পরে ওসির কক্ষে গেলে ওসি কাগজপত্র যাচাই না করেই তাঁর কাছ থেকে জমি-সংক্রান্ত সব কাগজপত্রের ফটোকপি নিয়ে প্রতিপক্ষকে দিয়ে দেন বলে অভিযোগ করেন হারুন। এমন ঘটনায় তিনি হতবাক হন বলেও জানান।
হারুন বলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রীর ওপর মারধর ও হামলার ঘটনায় মামলা করতে চাইলে ওসি তাঁকে মামলা না করে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকেও অভিযোগ দিতে বলেন। এ কারণে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
লিখিত বক্তব্যে হারুন বলেন, তাঁর বাবা আব্দুল করিম দেওয়ান ১৯৮৯ সালে হেবা শর্তে তাঁর সৎ ভাইদের নামে আরএস খতিয়ানের ৯৪ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। জমিটির মৌজা আমগাছী, আরএস খতিয়ান নম্বর ১০০ এবং জেএল নম্বর ১০৮। তাঁর দাবি, কয়েক মাস পর দলিলের মাধ্যমে ওই জমি আবার ফেরত নেওয়া হয়। ওই দলিলের নম্বর ৬১১৩/৮৯। তবে জমি ফেরত নেওয়ার বিষয়টি গোপন রেখে তাঁকে ও তাঁর মাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর জমিতে নিজের অংশ পাওয়ার দাবিতে ২০০৭ সালের ২৯ নভেম্বর আদালতে মামলা করেন হারুন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালে তিনি আদালতের ডিক্রি পান বলে জানান। ওই ডিক্রি অনুযায়ী একটি দাগে ৩ শতক এবং অন্য একটি দাগে ১৩ শতক-মোট ১৬ শতক জমিতে তাঁর অংশ নির্ধারিত হয়।
হারুনের দাবি, ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতের নেজারত বিভাগ ও পবা থানার পুলিশের উপস্থিতিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে ওই জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় সেখানে লাল নিশানও পুঁতে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তবে এরপরও জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিক মামলা ও বিরোধ চলমান রয়েছে বলে জানান হারুন। তাঁর অভিযোগ, সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর জমি নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে মারধর করা হয়।
হারুন আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর কয়েকজন সাংবাদিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর স্ত্রীর ভিডিও সাক্ষাৎকার নেন। পরে সেটি ফেসবুকে প্রকাশ করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কমেন্টে কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে মাদক কারবারি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব ঘটনারও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন হারুন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে পবা থানার ওসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মিডিয়া মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) গাজিউর রহমান বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভুক্তভোগী হারুনুর রশীদ জমি-সংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।